শনিবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৪

নোলক

 আল্ মাহমুদ

আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে
হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে।

নদীর কাছে গিয়েছিলাম, আছে তোমার কাছে?
হাত দিওনা আমার শরীর ভরা বোয়াল মাছে।
বললো কেঁদে তিতাস নদী হরিণ বেড়ের বাঁকে
সাদা পালক বকরা যেথায় পাখ ছাড়িয়ে থাকে।

জল ছাড়িয়ে , দল হারিয়ে গেলাম বনের দিক
সবুজ বনের হরিৎ টিয়ে করে রে ঝিকমিক।
বনের কাছে এই মিনতি, ফিরিয়ে দেবে ভাই
আমার মায়ের গয়না নিয়ে ঘরেক ফিরতে চাই।

কোথায় পাবো তোমার মায়ের হারিয়ে যাওয়া ধন
আমরা তো ভাই পাখপাখালি বনের সাধারণ।
সবুজ চুলে ফুল পিন্দেছি নোলক পরিনাতো!
ফুলের গন্ধ চাও যদি নাও, হাত পাতো হাত পাতো।
বলে পাহাড় দেখায় তাহার আহার ভরা বুক
হাজার হরিণ পাতার ফাঁকে বাঁকিয়ে রাখে মুখ।

এলিয়ে খোঁপা রাত্রি এলেন ফের বাড়ালাম পা
আমার মায়ের গয়না ছাড়া ঘরকে যাবো না।

রবিবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৪

পুতা লইয়া যাও !!!

 পল্লী কবি জসীম উদ্দিন...........

হাটে একটি প্রকাণ্ড বোয়াল মাছ উঠিয়াছে.....

এক ফকীর ভাবিল, এই বোয়াল মাছটার পেটি দিয়া যদি চারটি ভাত খাইতে পারিতাম! সে মাছের দোকানের কাছে দাঁড়াইয়া রহিল। একজন চাষী আসিয়া মাছটি কিনিয়া লইল। মুসাফির তাহার পিছে পিছে যাইতে লাগিল। লোকটি যখন বাড়ির ধারে আসিয়াছে তখন মুসাফির তাহার নিকটে যাইয়া বলিল, ‘সাহেব! আমি মুসাফির লোক। ভিক্ষা করিয়া খাই। কোনোদিন ভালো খাওয়া হয় না। আজ হাটে যাইয়া যখন ঐ বড় মাছটি দেখিলাম, মনে বড় ইচ্ছা হইল এই মাছটির পেটি দিয়া যদি চারটি ভাত খাইতে পারিতাম! তাই আপনার পিছে পিছে আসিয়াছি। দয়া করিয়া যদি আমার মনের ইচ্ছা পূরণ করেন বড়ই সুখী হইব।’ লোকটি বড়ই দয়ালু। সে খুব আদর করিয়া মুসাফিরকে আনিয়া বৈঠকখানায় বসাইল। তারপর মাছটি ভিতরে লইয়া গিয়া তাহার বউকে মুসাফিরের সমস্ত ঘটনা বলিয়া হুকুম করিল, ‘এই মাছটির পেটি বেশ পুরু করিয়া কাটিবে। পেটিখানা মুসাফিরকে দিতে হইবে।’ এমন সময় লোকটির একটি গরু ছুটিয়া গেল। সে তাড়াতাড়ি গরুটির পিছে পিছে দৌড়াইল। মাছ কুটিতে কুটিতে চাষীর বউ ভাবিল, ‘বাড়িতে ভালো কিছু খাবার পাক করিলে আমার স্বামী এমনি করিয়া মুসাফির লইয়া আসে। মুরগীর রানটা, মাছের পেটিটা সব সময়ই মুসাফিরদের দিয়া খাওয়ায়। এই বড় মাছের পেটিখানাও মুসাফিরকে খাওয়াইবে। যেমন করিয়াই হোক মুসাফিরকে আজ তাড়াইব।’ এই কথা ভাবিয়া বউটি খালি পাটার উপর পুতাখানা ঘষিতে আরম্ভ করিল আর সুর করিয়া কাঁদিতে লাগিল। অনেকক্ষণ কান্না শুনিয়া মুসাফির ভাবিল, না জানি বউটির কি হইয়াছে। সে বাড়ির ভিতর আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ‘মা জননী! তুমি কাঁদিতেছ কেন? তোমার কি হইয়াছে?’ বউটি বলিল, ‘বাবারে! সে কথা তোমাকে বলিবার নয়। আমার স্বামী মানা করিয়াছেন।’ মুসাফির বলিল, ‘মা! আমি তোমার ছেলে। আমার কাছে কোনো কথা গোপন করিও না।’ বউটি তখন আধেক কাঁদিয়া আধেক কাঁদিবার ভান করিয়া বলিল, ‘আমার স্বামী বাড়ির ভিতরে আসিয়া আমাকে বলিল, এই মুসাফির বড়ই লোভী। আমাদের পুতাখানা পাটায় ধার দিয়া চোখা করিয়া রাখ। মুসাফিরের গলার ভিতর দিয়া ঢুকাইয়া দিব। যাহাতে সে আর কাহারও মাছ দেখিয়া লোভ করিতে না পারে। তাই আমি কাঁদিতেছি। হায়! হায়! আমার স্বামী এই মোটা পুতা তোমার গলার ভিতরে ঢুকাইলে নিশ্চয় তুমি মরিয়া যাইবে, তাই আমি কাঁদিতেছি। কিন্তু স্বামীর হুকুম তো আমাকে মানিতেই হইবে।’ শুনিয়া মুসাফিরের তো চক্ষুস্থির। সে বলিল, ‘মা জননী! তুমি একটু আস্তে আস্তে পুতা ঘষ। আমি এখনই চলিয়া যাইতেছি।’ এই বলিয়া মুসাফির তাড়াতাড়ি লাঠি- বোঁচকা লইয়া দে চম্পট। এমন সময় বাড়ির কর্তা ফিরিয়া আসিয়া দেখে কাছারি ঘরে মুসাফির নাই। বউকে জিজ্ঞাসা করিল, ‘মুসাফির চলিয়া গেল কেন?’ বউ নথ নাড়িতে নাড়িতে বলিল, ‘তুমি বাড়ি হইতে চলিয়া গেলে মুসাফির বলে কি, ‘তোমাদের পুতাটা আমাকে দাও।’ দেখ তো, আমাদের একটা মাত্র পুতা। তা মুসাফিরকে দেই কেমন করিয়া? পুতা দেই নাই বলিয়া মুসাফির রাগিয়া চলিয়া গেল।’ স্বামী বলিল, ‘সামান্য পুতাটা দিলেই পারিতে। আমি না হয় বাজার হইতে আর একটি পুতা কিনিয়া আনিতাম। শিগ্গীর পুতাটা আমাকে দাও, আর মুসাফির কোন্ দিকে গিয়াছে বল!’ বউ পুতাটি স্বামীর হাতে দিয়া বলিল, ‘মুসাফির এই দিক দিয়া গিয়াছে।’ পুতাটি হাতে লইয়া সে সেই দিকে দৌড়াইয়া চলিল। খানিক যাইয়া দেখিল, মুসাফির অনেক দূর হন্ হন্ করিয়া চলিয়াছে। সে ডাকিয়া বলিতে লাগিল, ‘ও মুসাফির, দাঁড়াও—দাঁড়াও— পুতা লইয়া যাও।’ শুনিয়া মুসাফির উঠিয়া পড়িয়া দৌড়। চাষী যতই জোরে জোরে বলে, ‘ও মুসাফির! পুতা লইয়া যাও!—পুতা লইয়া যাও! মুসাফির আরও জোরে জোরে দৌড়ায়। সে ভাবে সত্যই চাষী তাহার গলায় পুতা ঢুকাইতে আসিতেছে। বোঁচকা- বুঁচকি বগলে ফেলিয়া সে মরিয়া হইয়া দৌড়ায়।

বোকা জোলা আর শিয়ালের কথা


b2ba8d4f86fd1690ef5d4c209aea64a7
‘কি হয়েছে?’

জোলা বললে, ‘আমার কাস্তের জ্বর হয়েছে।’

তা শুনে চাষা হাসতে-হাসতে বললে, ‘ওকে জলে ডুবিয়ে রাখ, জ্বর সেরে যাবে।’

জলে ডুবিয়ে কাস্তে ঠাণ্ডা হল, জোলাও খুব সুখী হল।
তারপর একদিন জোলার মায়ের জ্বর হয়েছে। সকলে বললে, ‘বদ্যি ডাক।’ জোলা বললে, ‘আমি ওষুধ জানি।’ বলে, সে তার মাকে পুকুরে নিয়ে জলের ভিতরে চেপে ধরল। সে বেচারী যতই ছটফট করে, জোলা ততই আরো চেপে ধরে, আর বলে, ‘রোস, এই তোর জ্বর সারছে।’
তারপর যখন বুড়ি আর ন্নছে-চড়ছে না, তখন তাকে তুলে দেখে, সে মরে গেছে। তখন জোলা চেঁচিয়ে কাঁদতে লাগল, তিনদিন কিছু খেল না, পুকুর পাড় থেকে ঘরেও গেল না।
এক শিয়াল সেই জোলার বন্ধু ছিল। সে জোলাকে কাঁদতে দেখে এসে বললে, ‘বন্ধু, তুমি কেঁদ না, তোমাকে রাজার মেয়ে বিয়ে করাব।’
শুনে জোলা চোখ মুছে ঘরে গেল। তারপর থেকে সে রোজ শিয়ালকে বলে, ‘কই বন্ধু, সেই যে বলেছিলে?’
শিয়াল বললে, ‘যখন বলেছি, তখন করাবই। আগে তুমি খান কতক খুব ভালো কাপড় বুনগে দেখি।’ জোলা দুমাস খালি কাপড়ই বুনল। তারপর শিয়াল তাকে খুব করে সাবান মেখে স্নান করতে বলে, রাজার কাছে মেয়ে চাইতে বেরুল।
কানে কলম গুঁজে, পাগড়ি এঁটে, জামা জুতো পরে, চাদর জড়িয়ে, ছাতা বগলে করে, শিয়াল যখন রাজার কাছে উপস্থিত হল, তখন রাজামশাই ভাবলেন, এ খুব পণ্ডিত লোক হবে। তিনি জিগগেস করলেন, ‘কি শিয়াল পণ্ডিত, কি জন্যে এসেছ?’
শিয়াল বললে, ‘মহারাজ, আমাদের রাজার সঙ্গে আপনার মেয়ের বিয়ে দেবেন কি-না, তাই জানতে এসেছি।’
শিয়াল মিছে কথা বলেনি, সেই জোলার নাম ছিল ‘রাজা’। কিন্তুু রাজামশাই মনে করলেন বুঝি সত্যি-সত্যিই রাজা। তিনি ব্যস্ত হয়ে জিগগেস করলেন, ‘তোমাদের রাজা কেমন?’
শিয়াল বললে-
‘দেখতে রাজা বড়ই ভালো
ঘরময় তার চাঁদের আলো।
বুদ্ধি তার আছে যেমন
লেখাপড়া জানে তেমন।
এক ঘায় তার দশটা পড়ে
তার গুণে লোক খায় পরে।’
সত্যি-সত্যিই সে জোলা দেখতে ভারি সুন্দর ছিল, তাই শিয়াল বললে, ‘দেখতে বড়ই ভালো।’ তার ঘরে চাল ছিল না বলে ভিতরে চাঁদের আলো আসত, তাই শিয়াল বললে, ‘ঘরময় চাঁদের আলো।’ কিন্তু রাজামশাই ভাবলেন, বুঝি সেটা তাঁর নিজের বাড়ির মতন খুব ঝকঝকে জমকালো একটা বাড়ি!
বুদ্ধি তার ছিল না, আর সে লেখাপড়াও জানত না। কাজেই শিয়াল বললে, ‘বুদ্ধি তার আছে যেমন, লেখাপড়া জানে তেমন।’ কিন্তু রাজা ভাবলেন, তার ভারি বুদ্ধি, সে ঢের লেখাপড়া জানে।
‘এক ঘায়, তার দশটা পড়ে,’ এ কথাও সত্যি। দশটা মানুষ নয়, দশটা ধানের গাছ! সে চাষা ছিল, কাস্তে নিয়ে ধান কাটত। রাজামশাই কিন্তু ভাবলেন, সে মস্ত বড় বীর, তার এক ঘায় দশজন মানুষ মরে যায়।
সে ধানের চাষ করত আর কাপড় বুনত। ধান থেকেই তো ভাত হয়, তাই লোকে খায়, আর কাপড় পরে। তাই শিয়াল বললে, ‘তার গুণে লোক খায় পরে।’ রাজামশাই কিন্তু সেইরকম বুঝলেন না। তিনি ভাবলেন, বুঝি সে ঢের গরীব লোককে খেতে পরতে দেয়।
কাজেই তিনি খুব খুশি হয়ে শিয়ালকে এক হাজার টাকা বকশিশ দিলেন, আর বললেন, ‘এমন লোকের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেব না তো কার সঙ্গে দেব? তোমার রাজাকে নিয়ে এস, আট দিনের পর বিয়ে হবে।’
শিয়াল সেই হাজার টাকার থলে বগলে করে, নাচতে-নাচতে জোলার কাছে এল। এসে দেখে, জোলা খালি কাপড়ই বুনছে। দুমাসে সে এত কাপড় বুনেছে যে সেই গ্রামের সকলের এক-একখানি করে কাপড় হতে পারে।
শিয়াল সেই টাকার থলে থেকে দুটি করে টাকা আর এক-একখানি কাপড় গ্রামের সকলকে দিয়ে বললে, ‘আট দিন পরে রাজার মেয়ের সঙ্গে আমাদের বন্ধুর বিয়ে হবে, আপনাদের নিমন্ত্রণ।’
শুনে তারা ভারি খুশি হল। জোলা বোকা হলেও বড় ভালোমানুষ ছিল, তাই সকলে তাকে ভালোবাসত।
তারপর শিয়াল আর সব শিয়ালের কাছে গিয়ে বললে, ‘ভাই সকল, আমার বন্ধুর বিয়ে, তোমাদের নিমন্ত্রণ। তোমরা গান গাইতে যাবে।’ শুনে শিয়াল সব হোয়া-হোয়া করে বললে, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, যাব, যাব।’
তারপর শিয়াল ব্যাঙদের কাছে গিয়ে বললে, ‘ভাই সকল, আমার বন্ধুর বিয়ে, তোমাদের নিমন্ত্রণ। তোমরা গান গাইতে যাবে।’
সকল ব্যাঙ ঘোঁৎ-ঘোঁৎ করে বললে, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, যাব, যাব।’ তারপর শিয়াল শালিকদের কাছে গিয়ে বললে, ‘ভাই সকল, আমার বন্ধুর বিয়ে, তোমাদের নিমন্ত্রণ। তোমরা গান গাইতে যাবে।’
শালিকের দল কিচির-মিচির করে বললে, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, যাব, যাব।’
তারপর শিয়াল তাঁড়িচাঁচাদের কাছে, ঘুঘুদের কাছে কুঁক্কো পাখিদের কাছে, উৎক্রোশ পাখিদের কাছে, বৌ কথা-ক-দের কাছে, ময়ূরদের কাছে, চোখগেলদের আর ভগদত্তদের কাছে গিয়েও তেমনি করে নিমন্ত্রণ করে এল। তারা সবাই বললে, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, যাব, যাব।’
এ-সব কাজ শেষ হতে সাতদিন লাগল। তার পরের দিন রাত্রিতে বিয়ে। শিয়াল তার বন্ধুদের জন্যে চমৎকার পোশাক ভাড়া করে এনে যখন সেই পোশাক তাকে পরিয়ে তখন সত্যিসত্যিই তাকে খুব বড় একটা রাজার মতন মনে হতে লাগল। যাদের নিমন্ত্রণ, তারা সবাই এল। যাবার সময় হলে, শিয়াল তাদের সকলকে নিয়ে রাজার বাড়ি চলল।
রাজার বাড়ি যখন এক ক্রোশ দূরে, তখন শিয়াল সকলকে ডেকে বললে, ‘ভাই সকল, ঐ দেখ জোর। অমনি পাঁচ হাজার শিয়াল মিলে চ্যাঁচাতে লাগল, ‘হুয়া, হুয়া, হুয়া, হুয়া!’
বারো হাজার ব্যাঙ বললে, ‘ঘোঁৎ, ঘোঁৎ, ঘেঁয়াও ঘেঁয়াও।’
সাত হাজার শালিক বললে-
‘ফড়িং সঙ্গে সঙ্গে চারিজনং
চকিৎ কাট কাট কাট গুরুচরণ!’
দুহাজার হাঁড়িচাঁচা বললে, ‘ঘ্যাঁচা, ঘ্যাঁচা, ঘ্যাঁচা, ঘ্যাঁচা, ঘ্যাঁচা!’
চার হাজার ঘুঘু বললে, ‘রঘু, রঘু, রঘু, রঘু, রঘু, রঘু!’
তিন হাজার কুঁক্কো বললে, ‘পুৎ, পুৎ, পুৎ, পুৎ, পুৎ, পুৎ!’
উনিশ শো উৎক্রোশ বললে, ‘হাঁ আঃ, হাঁ আঃ, হাঁ আঃ, ও হো হো হো হো!’
আর যত বৌ-কথা-ক, ময়ূর, ভগদত্ত আর চোখ-গেল, তারাও সবাই মিলে যার-যার নিজের গান ধরতে ছাড়ল না।
তখন শুনতে কেমন হয়েছিল, তা সেখানে থাকলে বোঝা যেত। রাজার বাড়ির লোকেরা দূর থেকে তা শুনে তো ভয়ে কাঁপতেই লাগল। তারপর যখন শিয়াল রাজামশাইকে খবর দিতে এল, তখন তিনি ভারি ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘শিয়াল পণ্ডিত, ওটা কিসের গোলমাল?’
শিয়াল বললে, ‘ওটা আমাদের বাজনা আর লোকজনের শব্দ।’
শুনে রাজা তো ভয়ে অস্থির হলেন। এত লোককে কোথায় বসাবেন, কি দিয়ে খাওয়াবেন, ভেবে ঠিক করতে পারলেন না। তিনি শিয়ালকে বললেন, ‘তাই তো, কি হবে?’
শিয়াল বললে, ‘ভয় কি মহারাজ! আমি এখুনি গিয়ে লোকজন সব ফিরিয়ে দিচ্ছি। খালি রাজাকে আপনার কাছে আনব।’
রাজা তখন বড়ই খুশি হয়ে শিয়ালকে পাঁচ হাজার টাকা বকশিশ দিলেন। শিয়াল ফিরে এসে মাঠের মাঝখানে অনেক টাকার মুড়ি-মুড়কি, আর ছোট ছোট মাছ ছড়িয়ে দিয়ে বললে, ‘তোমরা খাও।’ অমনি তার সঙ্গের সব শিয়াল, ব্যাঙ আর পাখি মিলে কাড়াকাড়ি করে সে সব খেতে লাগল। শিয়াল গ্রামের লোকদের প্রাণ ভয়ে সন্দেশ খাইয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিল। তারপর জোলাকে নিয়ে রাজার কাছে এল। আসবাব সময় তাকে শিখিয়ে আনল, ‘খবরদার! কথা বলো না যেন, তবে কিন্তু বিয়ে করতে পারবে না।’
রাজার বাড়ির লোকেরা বর দেখে কি যে খুশি হল, কি বলব! তারা খালি এইজন্য দুঃখ করতে লাগল যে, এমন সুন্দর বর, কিন্তু সে কথা কয় না কেন?
শিয়াল বললে, ‘ওঁর মা মরে গিয়েছেন, সেই দুঃখে উনি কথা বলছেন না।’ শুনে সবাই বললে, ‘আহা!’ কিন্তু আসল কথা এই যে, কথা বললেই কিনা জোলা ধরা পড়ে যাবে, তাই শিয়াল তাকে মানা করেছে।
খাবার সময় জোলাকে সোনার থালায় ভাত, আর একশোটা সোনার বাটিতে নানা রকম তরকারি আর মিঠাই দিয়েছিল। সে এক-একটি করে সবগুলো বাটি হাতে নিয়ে ওঁকে দেখল। শেষে তার কোনটাই চিনতে না পেরে, মিঠাই, ঝোল, অম্বল সব একসঙ্গে ভাতের উপর ঢেলে মেখে নিল। তারপর তার খানিকটা খেতে না পেরে, যা বাকি ছিল চাদরে বাঁধতে গেল।
সকলে শিয়ালকে বললে, ‘তোমাদের রাজা কেন এমন? কখনো কিছু খায়নি নাকি?’
শিয়াল চোখ ঠেরে তাদের কানে-কানে বলল, ‘উনি একবার মেখে দুই দুবার মেখে খান না, আর পাতে যা থাকে তা চাদরে বেঁধে, সেই চাদরখানি সুদ্ধ গরীবকে দেন। একজন গরীবকে ডাক। বলে সে খাবার-বাঁধা চাদরখানি জোলার গা থেকে খুলে গরীবকে দিতে দিল।
শোবার সময় জোলার ভারি মুশকিল হল। হাতির দাঁতের খাটে বিছানা, তাতে মশারি খাটানো।
সে বেচারা কোনদিন খাটও দেখেনি, মশারিও দেখেছি।
আগে বিয়ে খাটের তলায় ঢুকল, সেখানে বিছানা নেই দেখে বেরিয়ে এল। তারপর মশারির চারধার খুঁজে তার দরজা টের না পেয়ে বললে, ‘বুঝেছি, ঘরের ভিতর ঘর করেছে, তার দোর রেখেছে চালের উপর!’
বলে সে খাটের খুঁটি বেয়ে যেই মশারির চালে উঠতে গিয়েছে, অমনি সবসুদ্ধ ভেঙে নিয়ে ধপাৎ! তখন সে কাঁদতে কাঁদতে বললে, ‘ধান কাটতুম, কাপড় বুনতুম, সেই ছিল ভালো। রাজার মেয়ে বিয়ে করে মোর কোমর ভেঙে গেল।’
ভাগ্যিস সেখানে আর লোক ছিল না, কেবল রাজার মেয়ে ছিলেন, আর বাইরে শিয়াল বসে ছিল। রাজার মেয়ে অনেক কাঁদলেন, আর শিয়ালকে বকলেন। কিন্তু তাঁর ভারি বুদ্ধি ছিল, তাই এ কথা আর কাউকে বললেন না।
পরদিন রাজার মেয়ের কথায় শিয়াল গিয়ে রাজাকে বললে, ‘মহারাজ, আপনার জামাই বলছেন, আপনার মেয়েকে নিয়ে তিনি নানান দেশ দেখতে যাবেন। তাই ছুটি চাচ্ছেন।’
রাজা খুশি হয়ে ছুটি দিলেন, আর লোকজন, টাকাকড়ি সঙ্গে দিলেন। তারপর রাজার মেয়ে জোলাকে নিয়ে আর-এক দেশে গিয়ে বড় বড় মাস্টার রেখে তাকে সকল রকম বিদ্যে শেখাতে লাগলেন। দু-তিন বছরের মধ্যে জোলা মস্ত পণ্ডিত আর বীর হয়ে উঠল।

তখন খবর এল যে, রাজা মরে গেছেন, আর তাঁর ছেলে নেই বলে জামাইকে রাজা করে গিয়েছেন।
তখন খুব সুখের কথা হল।

---ঘাসফুল

শনিবার, ৮ নভেম্বর, ২০১৪

অধম ও উত্তম

-----মূল : শেখ সাদী,
        অনুবাদ- সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

কুকুর আসিয়া এমন কামড়
দিল পথিকের পায়
কামড়ের চোটে বিষদাঁত ফুটে
বিষ লেগে গেল তায়।
ঘরে ফিরে এসে রাত্রে বেচারা
বিষম ব্যথায় জাগে,
মেয়েটি তাহার তারি সাথে হায়
জাগে শিয়রের আগে।
বাপেরে সে বলে ভর্ৎসনা-ছলে
কপালে রাখিয়া হাত,
'তুমি কেন বাবা, ছেড়ে দিলে তারে
তোমার কি নেই দাঁত !'
কষ্টে হাসিয়া আর্ত কহিল
'তুই রে হাসালি মোরে,
দাঁত আছে বলে কুকুরের পায়
দংশি কেমন করে !
কুকুরের কাজ কুকুর করেছে
কামড় দিয়েছে পায়,
তা ব'লে কুকুরে কামড়ানো কি রে
মানুষের শোভা পায় ?

-----ঘাসফুল

এক ঠকের পাল্লায় তিন ঠক


এক.
সে অনেক দিন আগের কথাসে কালে জাত বলে একটা প্রথা ছিলআজকাল আর সেই প্রথা লক্ষ্য করা যায় নাসবার পোশাক-আসাক, কথা-বার্তা, চাল-চলন এক হয়ে গেছেবাইরের চেহারা দেখে বোঝাই মুসকিল যে, কে কোন জাতের মানুষ! এমন কি, নামের দারা জাত নির্ণয় করা এখন দুঃসাধ্য ব্যাপারএখন আমরা নিচু জাত বলে কাউকে অবজ্ঞা করি নাআসলে এটা আমাদের শিক্ষার ফলশিক্ষার দ্বারা আমরা বুঝতে পেরেছি যে, কোন মানুষই ছোট নয়সকল মানুষই চেষ্টা এবঙ পরিশ্রমের দ্বারা সাফল্য অর্জন করতে পারেকিন্তু পূর্বে এরকমটা ছিল নাসবার মাঝে জাতের পার্থক্য ছিলকেউ ছিল উচু জাতের কেউ বা আবার নিচু জাতেরকোন জাতের লোক ছিল বোকা আবার কোন জাতের লোকেরা ছিল খুবই বুদ্ধিমানতেমনি নিচু  কমবুদ্ধি গোছের লোক লোক হিসেবে গণনা করা হতো জোলাদেরসবার মধ্যে তাদেরকেই সবাই বেশি বোকা বলে জানত
বাঙলাদেশের উত্তরাঞ্চলে এক জোলা পাড়া ছিলসে পাড়ায় এক বুড়ো আর বুড়ি, মানে জোলা আর জুলি বাস করততাদের কোন ছেলে পুলে ছিল নাবুড়ো সারাদিন ক্ষেতে কাজ করত আর জুলি বুড়ি ঘর-গৃহস্থালির কাজ কর্ম করতজুলি বাড়ির পেছনে একটা সবজির বাগান করেছিললাউ, কুমড়া, ছীম, ডাটা ইত্যাদি জাতীয় সবজি ছিল তার বাগানেবুড়ি একদিন লক্ষ্য করল তার লাউ গাছটায় একটা কুড়ি ফুটেছেক্রমে সেই লাউয়ের কুরিটা একটা ছোট লাউয়ের রূপ ধরতে আরম্ভ করলপরদিন থেকে বুড়ি সেই গাছটার খুব যত্ন নিতে আরম্ভ করলবুড়ির যত্নের ফলে লাউটা খুব শীঘ্রই বড় হয়ে উঠলএকদিন বুড়ি তার বুড়োকে ডেকে বলল, দেখ, আমার লাগানো লাউ গাছটায় কত বড় একটা লাউ ধরেছেবুড়ো লাউটা দেখে খুব খুশি হয়ে বলল, বা, বেশ বেশ! খুব বড় তো! আমি আজই হাটে গিয়ে মসলাপাতি কিনে আনবআর সেটা মজা করে রান্না করে খাব
বুড়ি বলল, না আমরা এটা খাব না
বুড়ো একটু হতবাগ ভঙ্গিতে বলল, খাবে না? তা কি করবে শুনি?
বুড়ি বলল, লাউটা তুমি বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করগেতুমি তো জানো আমার ছাগল পালার কত সখকিন্তু আমাদের হাতে টাকা পয়সা না থাকায় আমরা ছাগলের বাচ্চা কিনতে পারছি নাআমার এই লাউটা বেশ বড় হয়েছে, এটা বিক্রি করে বেশ কিছু টাকা পাওয়া যাবেতুমি সেই টাকা দিয়ে একটি ছাগলের ছাগল কিনে আনবে বুড়ো মুখ ভ্যাঙচিয়ে বলল, ছাগল কিনে আনব? কোথায় লাউটা রান্না করে মজা করে খাব, তা নয়, উনি বলেন এটা বিক্রি করে ছাগল কিনে আনব
বুড়ি একটু রাগত স্বরে বলল, আমি যা বলছি তাই কর
বুড়ো বলল, তা ছাগল কিনে এনে লাভটা কি বল? উল্টো ওটাতে আরো কাজ বাড়িয়ে দেবেপ্রতিদিন তাকে ঘাস এনে খাওয়াতে হবেতারপর আবার মল-মূত্র ত্যাগ করে সারা বাড়ি নোংড়া করে দিবে
বুড়ি বলল, আসলে তুমি জোলা তো জোলাই রয়ে গেলেতুমি শুধু ছাগলের অপকারটাই দেখলেছাগল যে আমাদের বড়লোক করে দিতে পারে তা আর তুমি বুঝতে পারলে না বুড়ো এবার তার গলার স্বর সপ্তমে চরিয়ে বলল, এ্যা, আমার বাপ-দাদার বংশ তুলে কথা! পরক্ষনেই সে শান্ত হয়ে বলল, তা ছাগল আমাদের কি করে বড়লোক করবে শুনি?
বুড়ি বলল, তাহলে শোন, আমরা এটা ছাগল কেনার পর তা থেকে বাচ্চা হবেসেই বাচ্চা বিক্রি করে আমরা একটা গরুর বাচ্চা কিনবতখন গরু বড় হয়ে আমাদের দুধ দিবে আর বাচ্চাও দিবে তখন আমরা বাচ্চাগুলো আর দুধ বিক্রি করে অনেক টাকা পাব এভাবে আমাদের অনেক টাকা পয়সা এবং অনেক গরু ছাগল হয়ে যাবে। তখন আমাদের আর কোন দুঃখ থাকবে না।
বুড়ো বুড়ির কথা শুনে আহ্লাদে আটখানা হয়ে বলল, তোমার মাথায় এত বুদ্ধি! আমি আজই যাব হাটে। কুমরোটা বিক্রি করে একটা ছাগলের বাচ্চা নিয়ে আসব। এরপর সে বুড়িকে বলল, দাও তো, এক্ষনি লাউটা পেড়ে দাও। আমি সেটা হাটে নিয়ে যায়।
বুড়ি তখন বটি দিয়ে লাউয়ের ডগা কেটে নিয়ে এল। বুড়ো লাউটা কাঁধে নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেল হাটে। এদিকে বুড়ি ছাগল রাখার জন্য সব ব্যবস্থা করতে লাগল। ছাগলের ঘাস কাটার জন্য সে একটা কাস্তেও যোগার করল। তারপর, ছাগলের বাচ্চা বড় করে, তার বাচ্চা বিক্রি করে কি কি করবে, উঠোনের এক কোনে বসে সে তা ভাবতে লাগল।
দুই.
বুড়ো লাউটা এনে বাজারের এক কোনে বসে পড়ল। যে তার লাউয়ের দাম জিজ্ঞাসা করে, সে বলে, একটা ছাগলের বাচ্চা কেনার সমান দাম পেলে তবেই সে তার লাউ বিক্রি করবে। তার এ রকমের কথা শুনে কেয়ই আর তার লাউ কিনতে চাচ্ছে না। শেষে এক বেঠে গোছের লোক এসে লাউয়ের দাম জিজ্ঞাসা করায়, সে বুড়োর এই ধরনের কথা শুনেই বুঝে ফেলল যে, এই ব্যাটা খাঁটি জোলা। এর কাছ থেকে লাউ কেনা কোনো ব্যাপারই নয়। লোকটি বলল, তা বেশ আমি তোমাকে সেই সমানই দাম দেব। এই বলে সে তার পকেট থেকে একটি দশ টাকার নোট বের করে বলল, এই নাও। দশ টাকায় তুমি ভাল একটা ছাগল পেয়ে যাবে।
বুড়ো একটু উৎসুখভাবে বলল, বড় আর তাজা ছাগল পাওয়া যাবে তো?
লোকটি তখন মুচকি হেসে বলল, পাবে না মানে, দশ টাকায় তুমি একটি বড়সরো ছাগল পাবে। দাও বাপু এবার লাউটা দাও দেখি। এই বলে সে বুড়োর কাছ হতে লাউ নিয়ে চলে গেল। বুড়ো তখন টাকা নিয়ে ছাগল কিনতে গেল। কিন্তু অনেক ঘোরাঘুরির পরও দশ টাকায় সে কোন ছাগল পেল না। হতাশ হয়ে সে ফিরে যেতে লাগল। এদিকে সেই হাটেই তিন ঠক এসেছিল একটা ছাগল বেচতে। ভাদু, যদু আর মধু। এদের মধ্যে মধু একটু বেশি চালাক। সে এতক্ষণ এক কোনে দাঁড়িয়ে বুড়োর ছাগল কেনা দেখছিল। সে তখন বুড়ো কাছে এসে বলল, কি চাচা, ছাগল কিনবা নাকি?
বুড়ো বলল, তা বাবা ছাগল কেনার জন্যইতো এসেছিলাম, কিন্তু
- কিন্তু কি চাচা?
- আমার কাছে মাত্র দশটা টাকা আছে, এতে কেউ আমার কাছে ছাগল বিক্রি করছে না।
- আমার কাছে একটা ছাগল আছে চাচা। যদি পছন্দ হয় তা হলে নিতে পার।
বুড়ো অত্যন্ত উৎফুল্লভাবে বলল, পছন্দ আর অপছন্দ, একটা ছাগল হলেই হলো। মধু তখন তাদের ছাগলকে নিয়ে বুড়োকে দিল। বুড়ো তখন দশ টাকায় এতবড় ছাগল পেয়ে খুশিতে ডগমগ হয়ে বাড়ির পথে রওনা দিল।
ভাদু বলল, কিরে মধু? আমাদের না জানিয়ে ছাগল বেঁচে দিলি? তা কত দাম হল, তা এবার ভাগ কর।
- দশ টাকায় বিক্রি করলাম।
তার কথা শুনে তো যদু রেগে আগুন। সে বলল, দুইশত টাকা দামের ছাগল তুই দশ টাকায় বিক্রি করে দিলি? ভাদু বলল, আহম্মক কোথাকার! আমরা লোকেদের ঠকিয়ে খায়, আর তুই কিনা একটা জোলার কাছে ঠকে গেলি! এবার মধু বলল, আরে না। আমাকে ঠকায় এমন লোক এ তল্লাটে কেউ নেই।
যদু দাঁত কটমট করতে করতে বলল, একটা জোলা তোমার কাছ হতে দুইশত টাকার টাকার ছাগল দশ টাকায় নিয়ে গেল, এটা বুঝি ঠকানো হল না? মধু বলল, তোমরা আগে আমার কথা শুনো। আসলে দশটা টাকাও আমরা পেলাম এবং ছাগলও আমাদেরই থাকবে।
ভাদু বলল, সেটা কিভাবে?
- সে কথাই তো বলছি। তবে শোন, বুড়ো যেই পথে ছাগল নিয়ে যাবে সেই পথের তিন জায়গায় আমরা তিনজন দাঁড়িয়ে থাকব।
- আচ্ছা দাঁড়িয়ে থাকলাম, তারপর?
- তারপর সেই জোলা যখন ছাগল নিয়ে আসবে তখন আমরা বলব যে এটা শেয়ালের বাচ্চা। তখন জোলা ছাগল রেখে চলে যাবে। আর তখনই আমরা ছাগল ধরে নিয়ে চলে আসব।
তার কথা শুনে যদু কটমটিয়ে বলে উঠল, গর্দভের মত কথা বলিস না। মানুষ কি এতই বোকা যে, ছাগলের বাচ্চা আর শেয়ালের বাচ্চা চিনতে পারবে না?
- সকলে চিনতে পারলেও এই জোলা চিনতে পারবে না। এর চেহারা দেখেই আমি বুঝে গেছি যে, এ একেবারে হাদারাম। আর আমার অনুমান কখনোও মিথ্যে হবে না।
- যদু এবার চেঁচিয়ে বলে উঠল, তারপরো যদি আমরা ছাগল না পায় তাহলে তোর কাছ থেকেই আমরা ছাগলের দাম আদায় করে নেব।
মধু মুচকি হেসে বলল, আচ্ছা তাই হবে। এখন আমার প্ল্যান সকো ভাদু থাকবে বাজার হতে কিছু দুর গিয়ে সেই বটগাছতলায়। আর যদু তুই থাকবি মাঝামাঝি জায়গায়। আর আমি থাকব জোলার বাড়ির কিছু আগে। ভাদু ও যদু মাথা নেড়ে বলল, আচ্ছা তাই হবে। মধু বলল, তাহলে আর দেরি করিস না, তারাতারি নিজ নিজ জায়গায় চল যাই? জোলা বোধহয় বেশি দূর যায়নি। আর হ্যাঁ, অভিনয়টা কিন্তু ভালভাবে করিস। এই বলে তারা তিনজনেই বুড়োর আগেই রাস্তায় এসে দাঁড়িয়ে পরল।
তিন.
এদিকে বুড়ো খুশিতে নাচতে নাচতে বাড়ির পথে চলেছে। আর মনে মনে ভাবছে, সে বুড়িকে অবাক করে দেবে যে, দশ টাকায় সে কত বড় ছাগল কিনে এনেছে। বুড়ি তাকে সব সময় অকর্মা আর বোকা বলে গালি দেয়। এবার সে দেখিয়ে দেবে যে, সে কত বড় একটা কাজ করেছে। অল্প টাকা দিয়ে কত বড় ছাগল এনেছে। এমনি খুশি মনে সে সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে চলেছে বাড়ির দিকে। ভাদু আগেই দাঁড়িয়ে ছিল সেই বটগাছটার নিকট। জোলা তার নিকট এলে সে বলে উঠল, আরে ভাই তুমি শেয়ালের বাচ্চা নিয়ে কোথায় যাচ্ছ?
বুড়ো একটু অবাক এবং রাগত স্বরে বলল, কি যা তা বলছ! এটা শেয়ালের বাচ্চা হতে যাবে কেন? এটা তো ছাগলের বাচ্চা। এইমাত্র দশ টাকা দিয়ে কিনে আনলাম।
- বুঝতে পেরেছি, কেউ তোমায় ছাগলের বাচ্চা বলে এই শেয়ালের বাচ্চা দিয়ে ঠকিয়েছে। তুমি এটা ছেরে দাও, নইলে কামড় দেওয়ার সুযোগ পেলেই কামড়ে দেবে।
- তার কথা শুনে জোলা একটু দ্বিধায় পড়ে গেল। তবে টাকার মায়ায় এবং বুড়ির ভয়ে সে ছাগল ছাড়ল না। তারপরও ভয়ে সে ছাগলের দরিটা একটু বড় করে ধরল এবং সাবধানে হাঁটতে লাগল। এবার মাঝ পথে আসতেই দেখা হল যদুর সাথে। যদু তাকে দেখে বলল আরে ভাই, তুমি দিনে দুপুরে শেয়ালের গলায় দরি লাগিয়ে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? তার কথা শুনে বুড়ো এবার ঘাবরে গেল। সে ছাগলের দরিটা আরোও লম্বা করে ধরল, তবুও ছাড়ল না। সে ভাবতে লাগল আমাকে কি সত্যিই ঠকিয়েছে নাকি? যদি এটা শেয়ালের বাচ্চা নাই হবে তাহলে যেই দেখছে সেই কেন এটাকে শেয়ালের বাচ্চা বলছে? ভয় পেয়ে সে ছাগলের দরির একদম শেষপ্রান্তে ধরে হাঁটছে আর বার বার ফিরে তাকাচ্ছে কামড় দেয় কিনা?
এদিকে মধু তার বেশভূষা একটু পরিবর্তন করে প্রস্তুত হয়ে ছিল। জোলা তার নিকট ছাগল নিয়ে আসতেই সে লাফিয়ে উঠল। মধু ঘাবড়ে যাবার ভজ্ঞিতে চোখ মুখ সঙকুচিত করে বলল, আরে ভাই তুমি পাগল নাকি? একটা জলজ্যান্ত শেয়ালের গলায় দরি লাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছ!
বুড়ো অসহায় ভজ্ঞিতে তার দিকে তাকিয়ে বলল, ভাইরে যে দেখে সেই এটাকে শেয়াল বলছে। কিন্তু এটা যে আমি এক্ষনি হাট থেকে কিনে আনলাম। পুরো দশ টাকা দিয়ে আমি এই ছাগলটা কিনেছি।
মধু উত্তেজিত ভজ্ঞিতে বলল, আরে তুমি আহাম্মক নাকি? দশ টাকায় কেউ ছাগল পায়? এই বলে মধু আবার ছাগলটার দিকে তাকিয়ে লাফিয়ে উঠে বলল, ওরে বাবারে, যেভাবে পিট পিট করে তাকিয়ে আছে মনে হয় এক্ষুনি ধরে খেয়ে ফেলবে। বুড়ো মধু ভাব দেখে ভয় পেয়ে ততক্ষনাৎ ছাগলের দরি ছেরে দিল। আর মনের দুঃখে মাথা চাপড়াতে চাপড়াতে বলতে লাগল, হায়রে কি ঠকানোটাই না ঠকালো আমাকে। আমি বুড়ির কাছে গিয়ে কি বলল?
ছাগলটা ছাড়া পেয়ে সেখান থেকে চলে গেল। আর তিন ঠাক ভাদু, যদু আর মধু একত্রে হয়ে ছাগলটা ধরে ফেলল। এদিকে বুড়ো কিন্তু ছাগলের দরি ছেড়ে দিয়ে, বুড়ির ভয়ে বাড়ি ফিরে যায় নি। সে দুরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছাগলটাকে দেখছিল। আর মনে মনে ভাবছিল এটা যদি সত্যিই শেয়াল হয় তাহলে তো জজ্ঞলে চলে যাবে। আর ছাগল হলে জজ্ঞলে যাবে না। দুরে দাঁড়িয়ে সে এইসব ভাবছিল। তখনই দেখল যে, তিনটা লোক ছাগলটাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আর সংগে সংগেই সে মধুকে চিনে ফেলল। এদের তিনজনই ছাগলের বাচ্চাকে শেয়ালের বাচ্চা বলেছিল। তৎক্ষনাৎ সে বুঝে ফেলল যে, ওরা তিনজনেই তাকে ঠকিয়েছে। বুড়ো কিন্তু এবার আর বোকামি করল না, সে চুপি চুপি পেছন পেছন গিয়ে তাদের বাড়ি চিনে এল।
বুড়োকে অমন শুকনো মুখে আসতে দেখেই বুড়ি অনুমান করল যে, সে বোধহয় আবার ঠকেছে। সে জিঙ্গেস কর, কি হয়েছে, ছাগল কই?
বুড়ো শুধু একবার বুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা হেট করে বসে পরল। বুড়ি এবার ধমকের সুরে বলল, কি হয়েছে, বলবে তো।
বুড়ো কাচুমাচু হয়ে ভাঙা গলায় সবিস্তারে পুরো ঘটনাটাই খুলে বলল। বুড়োর সকল ঘটনা শুনে বুড়ি একেবারে অগ্নিমূর্তি ধারন করে বলল, আমি কি সাধে তোমায় হাদারাম বলি। কোনটা ছাগলের বাচ্চা আর কোনটা শেয়ালের বাচ্চা তাও তুমি চেন না। কিন্তু আমি আমার টাকা উসুল করেই ছাড়ব।
- কিভাবে? আমি কিন্তু আর তাদের কাছে যাব না। বুড়ো ভয়ে ভয়ে বলল।
- তোমাকে দিয়ে যে কোন কাজ হবে না, তা আমি ভাল করেই জানি। আমি আমার বাবার দেশের বাড়ি যাব।
- সেখানে গিয়ে কি হবে? খুব উৎসুক হয়ে বুড়ো জানতে চাইল। বুড়ি বলল, সেখানে আমার এক দূর সম্পের্কর ভাই আছে। সেও এক নম্বরের ঠক। তার কাছে এরা কিছুই না। আমি তাকে গিয়ে বলল সব ঘটনা।
পরদিনই বুড়ি রওয়ানা হয়ে গেল তার বাবার বাড়ির উদ্দেশ্যে। তারপর সেই ঠকের বাড়িতে গিয়ে তার কাছে খুলে বলল সব ঘটনা। সব শুনে ঠক বলল, বেশ আমি তাদের কাছ থেকে তোমার টাকা আদায় করে দেব। কিন্তু ঐ দশ টাকার পর যত কামাই হবে সব আমার। বুড়ি সাঁয় দিয়ে বলল, আমাদের ঐ দশটা টাকা পেলেই হল।
- বেশ তোমার জোলাকে কাল আমার এখানে পাঠিয়ে দিও। তারপর যা করার আমিই করব।
- ঠিক আছে, আমি কালকেই বুড়োকে পাঠিয়ে দেব। এই বলে বুড়ি বাড়ি ফিরে এল। পরদিন বুড়ো এলে ঠক বলল, তুমি কি কোন জায়গা হতে একটি ঘোড়ার ব্যবস্থা করতে পারবে?
- বুড়ো বলল, ঘোড়া আমি কোথায় পাব।? তবে হ্যাঁ নবাব বাড়িতে অনেক ঘোড়া আছে। কিন্তু তা তো আমি এমনি এমনি আনতে পারব না। ঠক বলল, তুমি এই পঞ্চাশটা টাকা নিয়ে যাও। দেখ তাতে কোন ঘোড়া টোরা পাওয়া যায় কি না। বুড়ো পঞ্চাশটা টাকা নিয়ে নবাব বাড়িতে গেল। সেখান থেকে একটা টিংটিঙে এক পাঁ খোরা একটা ঘোড়া নিয়ে এল। ঠক বলল, এটাই আমাদের চলবে। বুড়ো জানতে চাইল যে, এই ঘোড়া দিয়ে কি হবে। ঠক বলল, শোন আমি একজন দরবেশের সাজ পরব আর তুমি হবে আমার সাগরেদ। তারপর আমরা দরবেশ সাগরেদ এর বেশ ধরে তাদের গ্রামে যাব। তারপর সেখানে গেলেই তুমি সব বুঝতে পারবে।
চার.
সাদা পায়জামা, পায়েঁর গোড়ালি পর্যন্ত জুব্বা, মাথায় পাগড়ি এবং মুখে ইয়া লম্বা সাদা দাড়ি লাগিয়ে ঠক, পীরবাবা সাজল। আর ছেঁড়া-টেরা কাপড় দিয়ে একটি পুটিলি বানিয়ে বুড়ো কাধেঁ লটকিয়ে দিল। তারপর ঠক পীরবাবা ঘোড়ায় চেপে বসল আর জোলাকে বলল, তুমি ঘোড়ার মুখের লাগাম ধরে টেনে টেনে নিয়ে চল। এখন তাকে দেখে বোঝাই মুশকিল যে সে আসল পীর নয়। এভাবে চলতে চলতে তাঁরা সেই তিন ঠকের গ্রামে এসে পৌঁছল। ভাদু যদু আর মধু পথের ধারেই একটা গাছের নিচে বসে আলাপ করছিল। বুড়ো দূর থেকে দেখেই তাদের চিনতে পারল। সে ঠককে বলল, ঐ যে যারা তিন জন বসে গল্প করছে তারাই আমায় ঠকিয়েছে। ঠক বলল আচ্ছা তুমি আমাকে তাদের সামনে দিয়ে নিয়ে চল।
ওরা গল্প করতে করতে দেখতে পেল যে, একজন কামিল পীরসাহেব এদিকে আসছে। তাকে দেখে ভাদু বলল, এই দেখ, একজন পীরসাহেব আসছে এই রাস্তা দিয়ে। উনার চাঁদমুখখানা দেখেই আমার পরকালের কথা মনে পড়ে গেল। আমরা তো জীবন ভর মানুষকে ঠকিয়েই খেলাম। এখন পীরসাহেব স্বয়ং আমাদের সামনে দিয়ে যাচ্ছেন, চল আমরা তার কাছে মুরিদ হই। তওবা পড়ে সব পাপ মোচন করি।
যদু বলল, তুই ঠিকই বলছিস রে। আল্লাহ বোধহয় আমাদের ভাল করার জন্যই উনাকে পাঠিয়েছেন। মধু বলল, তুই ঠিকই বলেছিস। আমারো তাই মনে হয়। তবে চল আমরা তিন জনই তার কাছে তওবা করে মুরীদ হয়ে যায়। এই বলে তারা তিন জনই পীরবাবার ঘোড়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। মধু বলল, বাবা আপনাকে দেখেই আমরা বুঝতে পেরেছি আপনি একজন কামেল দরবেশ। বাবা আমরা অনেক পাপ কাজ করেছি এ জীবনে। আজ আপনার কাছে তওবা পড়ে আমরা আপনার মুরীদ হব বাবা। আজ রাতে আপনি আমাদের বাড়িতে দাওয়াত গ্রহন করুন বাবা।
ভাদুও তার সাথে যোগ করল, হ্যাঁ বাবা আপনাকে দেখার পরই আমাদের মনের পরিবর্তণ হয়েছে। আজ রাতে আপনি দয়া করে আমাদের বাড়ীতে তাসরীপ গ্রহণ করুন।
পীরবাবা একটু অন্যমনস্ক হয়ে বলল, তা বাবারা আমাদেরকে যে অনেক দূরে যেতে হবে। তা তোমরা যখন এত করে বলছ, তবে চল, আজ রাতটা না হয় তোমাদের এখানেই থাকি।
তারা তিনজন খুব খুশি হয়ে পীর বাবাকে নিয়ে এলে তাদের বাড়িতে। খুব যত্ন করে ভাল ভাল খাবার খাওয়ালো তারা পীরবাবাকে। আবার রাতে ঘুমানোর জন্য পীর বাবার জন্য একটা ঘরে সুন্দর করে বিছানা তৈরি করা হল। সব ঠিক হয়ে গেলে পীরবাবা বললেন, আমার ঘোড়াটা কোথায় থাকবে?
- কেন বাবা, সেটা গোয়াল ঘরে রেখে আসব।
- সংগে সংগে পীরবাবা হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, হেক মওলা বলে। চোখ দুটো সে লাল করে বলল, না এই ঘোড়া আমার সাথেই থাকবে। এটা যেমন তেমন ঘোড়া নয়।
তারা তিন জনই একটু ভয় পেয়ে গেল। মধু ভয়ে ভয়ে বলল, বাবা বেয়াদবী নিবে না। আমরা না জেনে ও কথা বলেছি। ঘোড়াও আপনার সাথেই থাকবে। তা বাবা এ ঘোড়ার বিশেষত্ব কি? না মানে জানতে চাচ্ছিলাম যে সাধারণ ঘোড়া থেকে এ ঘোড়া আলাদা কেন তাই জানতে চাচ্ছিলাম আর কি।
পীরবাবা তাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বললেন, আছে বৈকি! এ ঘোড়ার আশ্চর্য এক ক্ষমতা আছে।
তারা তিনজনই খুব উৎসুখভাবে জানতে চাইল কি ক্ষমতা বাবা? আমাদের বলবেন কি?
পীর সাহেব বললেন, তোমরা আমার কাছে মুরীদ হয়েছ। তোমরা আমার ছেলের মতো। তোমাদের আমি অবশ্যই বলল সে কথা। শোন তবে, আমার এ ঘোড়া অন্য সব সাধারণ ঘোড়ার মত নয় এর একটা অসাধারণ ক্ষমতা আছে। আর তা হল, এই ঘোড়া প্রতিদিন সকালে দুটি করে কাঁচা পয়সা দেয়। মধু আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল কিভাবে বাবা?
পীরসাহেব বললেন, সে প্রতিদিন তার মলের সাথে দুটি করে টাকা দেয়।
পীর সাহেবের কথা শুনে তারা তিনজনই তো অবাক। যদু বলল, এটা কি করে সম্ভব? একটি ঘোড়া তার মলের সাথে প্রতিদিন দুইটা করে কাঁচা পয়সা দিবে। এটা আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। ভাদু তার কথা শুনে বলল, পীর বাবার কথা কখনো অবিশ্বাস করতে নেই, তাহলে পাপ হয়। মধু বলল, আচ্ছা আমরা সকালে চুপি চুপি দেখব যে ঘোড়া সত্যি সত্যি কাঁচা পয়সা দেয় কিনা।
এদিকে ঠক পীরবাবা রাতে তার ঘোড়াকে খাওয়ানোর সময় ঘাসের সাথে দুটি কাঁচা পয়সা খাইয়ে দিল। তারপর ভোর হতেই পীরবাবা জোলাকে বলল, তুমি একটি পায়লা নিয়ে ঘোড়ার মলগুলো নিয়ে পুকুর ঘাটে গিয়ে ধুয়ে আন। আর চুপি চুপি সে জোলাকে বলল, আমি কিন্তু জানি যে ওরা লুকিয়ে আমাদের এই ঘোড়ার কাঁচা পয়সা পাওয়ার ব্যবাপারটা দেখবে। তুমি মল পরিস্কার করার সময় পয়সাগুলি ওদের দেখিয়ে দেখিয়ে আর ধোয়ার সময় বেশি করে বাজাবে। জোলা তার কথা মতো পায়লায় করে ঘোড়ার মল তুলে নিয়ে চলল পুকুর ঘাটে।
এদিকে তারা তিনজনই কিন্তু উত্তেজনায় সারারাত ঘুমালো না। ভোর হবার আগ হতেই তারা জেগে বসে ছিল। যেই তারা দেখল যে, পীরবাবার সাগরেদ ঘোড়ার মল নিয়ে যাচ্ছে তখনি তারা চুপি চুপি তার পেছন পেছন চলল বুড়ো পুকুর ঘাটে নেমে গেলে তারা পাড়ের কাছে লুকিয়ে সব দেখতে লাগল। বুড়ো তখন ঘোড়ার মল ধোয়ার সময় দেখতে পেল দুটি কাঁচা পয়সা। পয়তা তো থাকারই কথা। কারণ কাঁচা পয়সা তো আর হজম হয় না। বুড়ো তখন পয়সা দুটো তাদের শুনিয়ে শুনিয়ে খুব ভাল করে ধুতে লাগল। ঘোড়ার মলের ভিতর পয়সা দেখে তাদের সকলেরই চক্ষু স্থির। অতি বিস্ময়ের সাথে তারা একজন আরেকজনের দিকে চাওয়া চাওয়ি করতে লাগল। ভাদু বলল, দেখলি তো, পীরবাবা সত্যিই একজন খাটিঁ পীর। তা না হলে, একটা সামান্য ঘোড়া কিভাবে দুটি করে কাঁচা পয়সা দিতে পারে!
মধু বলল, আচ্ছা ভাদু-যদু, আমরা যদি কোন রকমে পীর বাবার এই ঘোড়াটা রাখতে পারি, তাহলে আর আমাদের কোন অভাব থাকবে না, আর আমাদের কোন কাজও করতে হবে না।
- তা তুই ঠিকই বলেছিস। এই ঘোড়াটি যদি আমরা রাখতে পারি, তাহলে আমাদের আর মানুষকে ঠকিয়ে খেতে হবে না। কিন্তু পীর বাবা কি ঘোড়াটা আমাদের দেবেন? মধু বলল, আমরা যদি অনেক আকুতি মিনতি করি তবে তিনি অবশ্যই দিবেন। আর উনি যত দামই চাইবেন আমরা তত দামই দিব।
- বেশ তবে চল, আমরা তিন জনই তবে পীরবাবার কাছে গিয়ে বলি। এই বলে তারা তিনজনই পীরবাবার নিকটে গিয়ে বিনয়ে সাথে বলল, বাবা আপনার কাছে আমাদের একটি আরজি আছে।
- পীর সাহেব বললেন, তোমরা আমার ছেলের মতো। তোমরা যে কোন আরজি আমার কাছে করতে পার। এই বলে পীর সাহেব মনে মনে বলতে লাগলেন আমি তো জানিই তোমরা কি বলবে।
মধু বলল, বাবা আপনি তো চলেই যাবেন তো আপনার স্মৃতি স্বরূপ আপনার এই ঘোড়াটা আমাদেরকে দিয়ে যান। বিনিময়ে যদি টাকা পয়সা লাগলে আমরা তাও দিব। বাবা আপনি না করবেন না। সবাই একসাথে বাবার নিকট জোরহাত করে বলতে লাগল।
পীর বাবা মুখটা একটু গম্ভীর করে বললেন, আমার এই ঘোড়াটা যে একটি অসাধারন ঘোড়া তা তো তোমাদের আগেই বলেছি। এই ঘোড়া একটি অমূল্য ঘোড়া। দশ হাজার টাকা দিলেও এর উচিৎ মূল্য হবে না। তবে তোমরা যেহেতু এত করে বলছ তবে আমি তোমাদের এই ঘোড়া দিয়ে দিলাম। তবে হয়েছে কি আমি তো দরবেশ মানুষ দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়ায় সে জন্য একটি ঘোড়া আমার সব সময়ই লাগে।
মধু তৎক্ষনাৎ বলে উঠল, বাবা এই একটির বদলে দুইটি ঘোড়া কিনার সমান দাম দিয়ে দিচ্ছি। এই বলে তারা তিনজন মিলে হাজার দশেক টাকা যোগা করে পীর বাবাকে দিল। পীর বাবা মনে মনে মহাখুশি হয়ে তাদেরকে ঘোড়া দিয়ে দিলেন। আসার সময় পীরবাবা তাদেরকে তার বাড়ির ঠিকানাও দিয়ে দিলেন আর বললেন, যদি তোমাদের কোন প্রশ্ন থাকে তবে অবশ্যই আমার কাছে আসবে। এই বলে ঠক জোলাকে সাথে নিয়ে বাড়ির পথে রওয়ানা হলো।
পথে জোলা ঠককে জিঙ্গেস করল, আচ্ছা আপনি ওদেরকে আপনার বাড়ির ঠিকানা দিয়ে আসলেন কেন? যখন দেখবে যে ঘোড়ার পেট হতে পয়সা বের হয় না তখন তো তারা আপনাকে মারতে আসবে। ঠক মুচকি হেসে বলল, সে ভাবনা তোমাকে ভাবতে হবে না। তুমি তোমার দশ টাকার বদলে বিশ টাকা নিয় বাড়ি চলে যাও। জোলা এত কিছু না বুঝে বিশ টাকা পেয়ে খুশি হয়ে বাড়ি চলে গেল।
ওদিকে ভাদু, মধু আর যদুর সে কি আনন্দ। তারা একে অপরকে বলতে লাগল। আমরা জীবনে এই প্রথম একটা কাজের মতো কাজ করেছি। ভাদু বলল, আমাদের আর কোন চিন্তা নেই। ঘোড়া প্রতিদিন সকালে পয়সা দিবে। আমরা এখন টাকার খনি পেয়ে গেছি। তারা তিনজনই সারাদিন ঘোড়ার খুব যত্ন করল। ভাল ভাল ঘাস বাছাই করে ঘোড়াকে খুব করে খাওয়ালো। রাতের বেলা তারা ঘোড়াকে তাদের শোবার ঘরেই রাখল। তাও আবার সুন্দর বিছানা করে। তিনজনই ঘোড়ার পাশে বসেই রাত কাটিয়ে দিল। ভোর হতেই তারা অপেক্ষা করতে লাগল কখন ঘোড়া মল দেবে। সারাদিন খুব খাওয়ার পর ঘোড়া সকালে অনেক বেশি মল ত্যাগ করল। তিনজন মিলে দুইটি পায়লাতে করে সেই মল নিয়ে নাচতে নাচতে গেল পুকুর ঘাটে। মহা উৎসাহের সহিত তারা মল ধুতে লাগল। কিন্তু এ কি মল ধুতে ধুতে তো প্রায় শেষ হয়ে এল কিন্তু পয়সা কোথায়! দু পায়লা মলের সব ধুয়ে শেষ হয়ে যাবার পরও যখন পয়সা পেল না তখন তারা সকলেই খুব চিন্তিত হয়ে পড়ল। মধু বলল, আচ্ছা আমরা কি কোন ভুল করে ফেলেছি নাকি। যদু বলল নারে আমার মনে হয় পীরবাবা আমাদেরকে ঠকিয়েছে। মধু বলল চল আমরা এখনি পীর বাবার কাছে যাব। এই বলে তখনই তারা তিনজন রওয়ানা হয়ে গেল পীর বাবার বাড়ির উদ্দেশ্যে।
পাঁচ.
এদিকে ছদ্মবেশী ঠক পীরবাবা বাড়িতে বসে ভাবতে লাগল কি করা যায়। কারণ তিনি জানতেন যে ঘোড়ার মলের সাথে পয়সা না পেয়ে তারা তিন জন অবশ্যই আসবে। ঠক পীরবাবা তার বাড়ির পেছনে জঙ্গলে বসে বসে ভাবতে লাগলেন এখন কি করা যায়। তিনি ভাবতে লাগলেন যে, এবারো একটি অলৌকিক কিছু করে দেখাতে হবে। যাতে তার প্রতি তাদের বিশ্বাস আরো বেড়ে যায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ সে একটি গাছের দিকে লক্ষ্য করল। গাছের মগডালে একজোড়া কবুতর বাসা বেঁধেছিল। কবুতর দুটিকে দেখেই তার মাথায় একটি বুদ্ধির উদয় হলে সে তৎক্ষনাত গাছে উঠে কবুতরের বাসা হতে এক জোড়া কবুতর নামিয়ে আনল। কবুতর জোড়া বাড়িতে এনে সে তার বউকে বলল শুনো আমার খোজেঁ তিনজন লোক আসবে। তারা এখানে এলে আমি একটি কবুতর নিয়ে বাড়ির পেছনে লুকিয়ে থাকব। আর একটি কবুতর খাঁচার ভেতরে থাকবে। তারা এসে যখন আমার খোঁজ করবে তখন তুমি তাদের সামনে এই কবুতরটিকে এনে বলবে যে যাও তো বাবা তোমার পীরবাবাকে ডেকে নিয়ে এসো। এই বলে তুমি কবুতরটি ছেড়ে দেবে। আর কিছুক্ষণ পরই আমি অন্য কবুতরটি নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসব। ঠকের বউ মাথা নেড়ে সম্মতি দিলে ঠক একটি কবুতরকে খাঁচায় ভরে বারান্দায় ঝুলিয়ে রাখল আর অন্যটি সে হাতে করে নিয়ে বাড়ির পেছনে লুকিয়ে থাকল।
এদিকে যদু মধু আর ভাদু তিনজনেই পীরসাহেবের বাড়িতে এসে উপস্থিত। বারান্দায় দাড়িয়েঁ তারা ডাকতে লাগল, পীর বাবা বাড়িতে আছেন? তাদের ডাক শুনে ঠকের বউ বাইরে এসে তাদেরকে দেখেই বুঝতে পারল যে তাদের কথাই তার স্বামী বলে গিয়েছে। সে তাদেরকে বলল তোমরা বারান্দায় এসে বসো। আমি এখনি ওকে দিয়ে ডাকতে পাঠাচ্ছি। তারা তিন জন দেখল যে সেখানে তারা ছাড়া আর কেউ নেই। তাই মধু জানতে চাইল, পীর মা, কাকে দিয়ে ডাকতে পাঠাবেন? ঠকের বউ বলল, কেন এই কবুতরটি ডেকে নিয়ে আসবে। তারা তিনজনই অবাক হয়ে বলল, কবুতর কিভাবে ডেকে নিয়ে আসতে পারে?
ঠকের বউ মুচকি হেসে বলল, তোমার পীরবাবা হচ্ছেন একজন কামিল মানুষ। তার কথা সব পশুপাখিই শুনে। এই বলে ঠকের বউ খাঁচা হতে কবুতরটিকে এনে তাদেরকে দেখিয়ে দেখিয়ে বলল, যাও তো সোনা তোমার পীর বাবা কোথায় আছে উনাকে ডেকে নিয়ে এসো। আরো বলবা যে উনার তিনজন সাগরেদ উনার সাথে সাক্ষাত করতে এসেছে। এই বলে ঠকের বউ কবুতরটিকে ছেড়ে দিল। কবুতরটি ছাড়া পেয়ে বনের কবুতর উড়ে বনের ভিতর চলে গেল।
যদু, মধু আর ভাদু একজন আরেকজনের দিকে বিস্ময়ে চাওয়া চাওয়ি করতে লাগলো। যদু বলল, এই পায়রা যদি সত্যিই পীরবাবাকে ডেকে নিয়ে আনতে পারে তবে উনি যে সত্যিই একজন কামিল পীর তা আমার বিশ্বাস হয়ে যাবে।
অন্যদিকে ঘরের পিছনে লুকিয়ে থাকা ঠক সব শুনছিল। সে কিছুক্ষণ বিলম্ব করে তার কাছে থাকা অন্য কবুতরটি কোলে করে তার মাথায় আদর করতে করতে বাড়িতে এসে ঢুকল। তারা তিনজন এই কান্ড দেখে অবাক্য হয়ে গেল। ঠক পীরবাবা তার কোল থেকে কবুতরটিকে নিয়ে খাঁচার ভেতরে রেখে বলল তোমরা যে এসেছো তা আমার কবুতরটি আমাকে গিয়ে বলেছে। নইলে আমি আরো দেরি করে আসতাম। তোমাদের কথা শুনেই আমি খুব তারাতারি এসে পড়েছি। আর তোমরা যে সমস্যার মধ্যে আছ তাও আমি বুছতে পেরেছি। তবে শুনো আমার দেয়া নিয়মের অনিয়ম করলে তার সমাধান তো পাওয়া যাবেই না তার উপর আরো বড় কোন ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তা বাবারা তোমরা এসেছো, বিশ্রাম নাও। আমি তোমাদের খাবাবার দাবারের ব্যবস্থা করি গে। এই বলে ঠক তার বউকে রান্নাবান্না করার জন্য বলল।
এদিকে তারা তিন জন ফিসফিসিয়ে বলতে লাগল শোন, আমরা নিশ্চই ঘোড়ার সাথে কোনো অনিয়ম করে ফেলেছি। তাই হয়তো ঘোড়া আমাদের কাঁচা পয়সা দেয়নি। ভাদু বলল, ঠিকবলেছিস। যে মানুষের কথা পশুপাখি মান্য করে তিনি কখনোই আমাদের ঠকাতে পারে না। মধু বলল, তা ঠিক আছে কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা।
- কি কথা ভাদু আর যদু জানতে চাইল।
মধু বলল, বাবা বললেন যে, তার নিয়মের অনিয়ম করলে সমাধানের বদলে উল্টো আরো বেশি ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তাই আমাদের ঘোড়ার বিষয়টি বাবাকে জানানো ঠিক হবে না। তবে আমার মাথায় আরো একটি বুদ্ধি এসেছে। তারা দুজন জানতে চাইল কি বুদ্ধি? মধু বলল শোন, এই কবুতরটিকে যদি আমরা কোন রকমে আমাদের সাথে করে নিয়ে যেতে পারি তবে আমাদের অনেক লাভ হবে।
- সে কিরকম?
- আমরা তো কাজে কর্মে অনেক সময় অনেক দূরে চলে যায় তখন এই কবুতরটি জরুরি প্রয়োজনে আমাদের যে কোনো জায়গা হতে ডেকে আনতে পারবে। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো ঘোড়াটি কিনে আমরা যে ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছি, এই কবুতরটি যদি আমরা নিয়ে যেতে পারি তবে তা উশুল হয়ে যাবে।
ভাদু বলল, কিন্তু পীরবাবা কি কবুতরটি দিতে রাজি হবেন?
- আমরা সবাই জোড় দিয়ে মিনতি করে বললে তিনি অবশ্যই দিবেন। এই ভেবে তারা তিনজনই পীরবাবার সামনে গিয়ে বলল, বাবা আপনার দোয়াই আমাদের আর কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এত দূর হতে আমরা এসেছি আপনার কাছে শুধু আপনার দোয়া নিতে। আর বাবা আপনার কাছে আমাদের আরেকটি ছোট আবদার রয়েছে, যদি অনুমতি দেন তো বলি?
পীরবাবা বলল, বাবারা তোমরা আমার সন্তানের মতো। এতো দূর হতে এসে আমার কাছে তোমরা কিছু একটা আবদার করলে আমি অবশ্যই রাখব। বল তোমরা কি চাও?
মধু বলল, বাবা আমরা অনেক সময় কাজে কর্মে বাড়ি থেকে অনেক দূরে চলে যাই। তখন আপনার বউমারা আমাদের জরুরি কোন খবর তারাতারি পাঠাতে পারে না। আপনি দয়া করে যদি আপনার এই পায়রাটা আমাদেরকে দিতেন তবে আমরা খুব উপকৃত হতাম।
পীরবাবা তখন হেসে উঠে বলতে লাগলেন, এই কথা! ঠিক আছে বাবারা তোমরা আমার এই পায়রা নিয়ে যাও। আমি বন জঙ্গল হতে অন্য কোন পশুপাখি এনে আবার বস মানিয়ে নেব।
তারা তিনজনই আনন্দে লাফিয়ে উঠল। আপনার অনেক শুকরিয়া বাবা। তাহলে আমরা আজকে যাই। পীরবাবা বললেন, খাওয়া দাওয়া করে যাও। তারা খুশিতে অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে বলতে লাগল বাবা অন্য কোনো দিন এসে খেয়ে যাব আজ আমরা আসি। এই বলে তারা খাঁচাসহ কবুতরটি নিয়ে লাফাতে লাফাতে বাড়িতে ফিরে এলো।
বাড়িতে এসেই তাদের বউদের ডেকে এনে বলতে লাগল, শুনো আমরা যখন বাড়ির বাইরে থাকবো তখন যদি তোমাদের জরুরি কোন প্রয়োজন হয় তবে এই কবুতরটি বলবে যে যাও সোনা তোমার বাবাকে ডেকে নিয়ে এসো। তখন সে আমাদের ডেকে নিয়ে আসবে।
বউয়েরা এই কথা শুনে হেসে উঠে বলল, তাই কোনোদিন হয় নাকি।
তারা ধমক দিয়ে বলল, এটা যেমন তেমন কবুতর নয়। এই কবুতর আমাদের পীরবাবা আমাদেরকে দিয়েছে।
পরদিন সকালে তারা খুব সকালে ঘুম থেকে উঠেই লাঙ্গল-জোয়াল কাধেঁ নিয়ে রেডি মাঠে যাওয়ার জন্য। যাওয়ার আগে তাদের বউদের বলে গেল শোন দুপুরে রান্না হয়ে গেলে কবুতরটিকে বলবে আমাদের ডেকে আনার জন্য। এই বলে তারা তিনজনই মাঠে চলে গেল। তারা বাড়ির আশে পাশে না থেকে সেদিন খুব দুরের জমিতে কাজ করার জন্য গেল। তিন বউ তখন এই মজার বিষয়টি জানার জন্য কৌতুহলী হয়ে উঠল। অন্যদিন তারা একটু বেলা করে রান্না বান্না বসায় কিন্তু সেদিন তারা তিনজনই একত্রে মিলে খুব সুস্বাদু আর অনেক রকমের রান্না তারাতারি রেডি করে ফেলল। তারা তিনজনই তখন কবুতরের খাঁচা হতে কবুতরটি বের করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে লাগল, যাও সোনা তোমাদের বাবাদের ডেকে নিয়ে এসো। এই বলে তারা কবুতরটিকে ছেড়ে দিল। বন্য কবুতর ছাড়া পেতেই উড়ে চলে গেল বনের ভেতরে। বউয়েরা কবুতরটিকে ছেড়ে দিয়ে সব কিছু রেডি করে পরিপাটি করে সাজিয়ে নিয়ে বসে বসে অপেক্ষা করতে লাগল স্বামীদের জন্য।
ওদিকে যদু, মধু আর ভাদু মহা আনন্দে জমিতে হাল চাষ করতে লাগল। অন্যদিনের তুলনায় তারা আজ বেশি বেশি করে পরিশ্রম করছে। দুপুর হয়ে আসতেই তারা আগ্রহের সহিত অপেক্ষা করতে লাগল যে, এই বুঝি কবুতরটি এসে তাদের খবর দেবে যে, রান্না বান্না শেষ আপনাদের খাবার জন্য ডাকছে। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যাওয়ার পরো যখন কবুতর এলো না তখন যদু বলল, কি ব্যাপার বল তো, তারা কি এখনো রান্না বান্না শেষ করেনি। মধু বলল ভাই আমার মনে হয় তারা রান্না বান্না ছেড়ে গল্প গুজবে মেতে উঠেছে। ভাদু বলল, চল আজকে বাড়িতে গিয়ে তাদেরকে একটা উচিৎ শিক্ষা দিব। এই বলে তারা তিনজনই খুব রাগান্বিত হয়ে বাড়িতে ফিরে এসেই দেখল যে, তাদের তিন বউ উঠোনে পাটি বিছিয়ে আলাপ করছে। দেখেই তাদের মাথা গরম হয়ে গেল। কোনো কথা না বলেই তারা এসে তাদের বউকে মারধর করতে লাগল। বউয়েরা খুব অবাক হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, কি ব্যাপার তোমরা আমাদের মারছ কেন?
- মারছি কেন? ভাদু রাগে গড় গড় করতে করতে বলল, আমরা সারাদিন রোদে পুরে মাঠে গিয়ে কাজ করছি আর তোমরা আমাদের কথা ভুলে গিয়ে রান্না বান্না ছেড়ে দিয়ে এখানে বসে গল্প করছ?
বউয়েরা তখন বলতে লাগল, কি বলছ তুমি, আমরা আজ অন্যদিনের চেয়ে তারাতারি রান্না বান্না শেষ করে সেই কখন দুপুরের আগেই কবুতরটিকে ছেড়ে দিয়েছি তোমাদের ডেকে আনার জন্য।
এই কথা শুনে তাদের মাথা আরো খারাপ হয়ে গেল। বলে কি? কবুতরকে ডাকতে পাঠিয়েছে, তবে আমরা কোনো খবর পায়নি কেন? মধু বলল ভাই এবার আমার সন্দেহ নাই যে, পীর বাবা আমাদের ঠকিয়েছে। ভাদু বলল, তাই যদি হয় তবে উনার কপালে খারাপি আছে। চল আমরা কাল সকালেই যাব পীর বাবার কাছে গিয়ে সব উসুল করে নিয়ে আসব।
ছয়.
অন্যদিকে ঠক পীর সাহেব আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন যে এবার তারা একটু রেগে মেগেই আসবে। তাই আমাকে প্ল্যানটাও করতে হবে একটু জটিল ধরনের। অনেক ভেবে চিন্তে ঠক তার বউকে নিয়ে একটি একটি বুদ্ধি গড়ল। ঠক একয় ধারালো ছুড়ি, একটি মাছের ফুলকা আর কিছু লাল রং এসে তার বউকে বলল, শোন এবার তারা একটু ক্ষেপে আসবে। আমি এই মাছের ফুলকার ভেতরে লাল রং ঢুকিয়ে দিব, তার তুমি সেটা তোমার গলায় বেঁধে রাখবে। তারা এলে আমি যখন তোমাকে তাদের জন্য রান্না করতে বলব তখন তুমি আমার সাছে ঝগড়া করবে। আর তখন আমি ধারালো সেই ছুরিটা দিয়ে তোমাকে উঠোনে ফেলে দিয়ে তোমার গলায় বাঁধা ফুলকাটি কেটে দিব, তখন তুমি মৃত্যু যন্ত্রনায় কাতরানোর অভিনয় করে ছটফট করতে করতে মরে যাওয়ার ভান করবে। তারপর আমি সেই ছুড়িটা পানিতে ধুয়ে যখন তোমার গলায় ফেলব তখন তুমি তারাতারি উঠেই রান্না বান্না করতে বসে যাবে। ঠকের বউ তাই হবে বলে সম্মতি জানাল।
পরদনি সকালেই যদু মধু আর ভাদু এসে হাজির হলো ঠকের বাড়িতে। তারা বাড়ির বাইরে থেকেই জোরে জোরে চিৎকার করতে লাগল পীরবাবা পীরবাবা বাইরে আসেন, তারাতারি বাইরে আসে আপানর সাথে আমাদের কথা আছে।
ঠক বাইরে এসে তাদেরকে বলতে লাগল তোমরা আগে শান্ত হয়ে বসো তারপর তোমাদের সব কথা শুনছি।
ভাদু কর্কশ গলায় বলতে লাগল, না আমরা আপনার এখানে বসতে আসিনি। আপনি পরপর দুটি জিনিস আমাদের দিয়েছেন। তার কোনোটিই আমাদের কাজ লাগেনি। আপনি আমাদের ঠকিয়েছেন। এই বলে তারা তিনজনই চিৎকার চেঁচামেচি করতে লাগল।
- শোন বাছারা, এমনটি যে হবে তা আমি আগেই অনুমান করেছিলাম। তোমরা একটি সাধারন নিয়মও পালন করতে পারো না। তোমরা বার বার ভুল কর। তবে শোন আমার কাছে যখন এসেছো তখন আমি সব ঠিক করে দেব। আগে তোমরা বাড়ির ভিতের এসে বসে বিশ্রাম করো। এই বলে পীর বাবা তাদেরকে সাথে নিয়ে বাড়ির ভিতর গেলেন।
ঠকের বউ আগে থেকেই লাল রং ভর্তি মাছের ফুলকা গলায় বেঁধে রেখেছিল। পীর বাবা বাড়িতে ঢুকেই তার বউকে বলতে লাগল এই শোনো আমার বাছারা এসেছে, তাদের জন্য তারাতারি রান্না বান্নার আয়োজন কর।
এই কথা শুনেই ঠকের বউ বলে উঠল, আমি যার তার জন্য রান্না করতে পারব না। পীর বাবা বলল, যারতার মানে ওরা আমার সাগরেদ আমার ছেলের মতো। তুমি এখনি গিয়ে রান্না কর। ঠকের বউ গলা চড়িয়ে বলতে লাগল, আমি বলেছি রান্না করতে পারব না তো পারব নাই। তোমার দরকার হলে তুমি নিজে গিয়ে রান্না কর। এইসমস্ত কথা বলে পীর বাবার সাথে ঝগড়া শুরু করে দিল। পীর বাবা তখন রেগে মেগে বলল, রান্না করতে পারবি না, দারা দেখাচ্ছি মজা বলেই তার বউকে টেনে এনে তাদের তিনজনের সামনে এনে উঠোনে ফেলে দিল। আর সেই ধারালো ছুরিটা এনে তার গলায় বাঁধা ফুলকাটি কেটে দিল। ফুলকা কাটার সাথে সাথে ফুলকার ভেতরের রং বেরিয়ে পড়ল। আর ঠনের বউ যন্ত্রনা পাওয়ার অভিনয় করে ছটফট করতে করতে মরে যাওয়ার ভান করে পড়ে রইল।
এই দৃশ্য দেখে তারা দিনজনই লাফি দিয়ে উঠে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, বাবা আপনি এ কি করলেন! পীর মাকে আপনি মেরে ফেললেন?
পীর বাবা মুচকি হেসে বলল, তোমরা ভয় পেয় না, আরাম করে বস। এখনি সব ঠিক হয়ে যাবে।
তারা কাঁপতে কাঁপতে বলল, কি বলছেন বাবা, আপনি পীর মাকে মেরে ফেলেছেন এখন কি করে সব ঠিক হয়ে যাবে? পীর বাবা তখন মধুকে বলল, যাও এই বাটিটিতে করে এক বাটি পানি নিয়ে এসো। মধু বাটিতে করে পানি নিয়ে আসলে পীর বাবা তার ছুরিটিতে লেগে থাকা রং বাটির পানিতে ধুয়ে ফেললেন। এবং সেই বাটির পানি তার বউয়ের গলায় ছিটিয়ে দিলেন। আর সাথে সাথেই তার বউ ধরফর করে লাফ দিয়ে উঠে পড় এবং উঠেই বলল, আমি এখনিই রান্না বসাচ্ছি বলেই সে রান্না ঘরে চলে গেল।
এই ঘটনা দেখে যদু মধু আর ভাদু একেবারে থ হয়ে গেল। কি বলতে তারা কিছুই বুঝতে পারছে না। তারা যে পীর বাবার কাছে এসেছিল তাদের ঠকানোর কথা বলতে তা তারা বেমালুম ভুলেই গেলা। মধু বলল, বাবা এটা কি করে সম্ভব? আপনি মরা মানুষকে কি করে জীবিত করে তুললেন?
- তবে শোন বাছারা, এই যে ছুরিটি তোমরা দেখছ, এটি দেখতে সাধারন লোহার একটি ছুরি হলেও এটি কিন্তু মোটেই কোন সাধারন ছুরি নয়। এই ছুরি যদি তোমাদের কাছে থাকে তবে তোমরাও এই কারিসমাতি দেখাতে পারবে। মোট কথা যার হাতে এই ছুরি থাকবে সেই এই কারিসমাতি করতে পারবে। তারা তিনজনেই অনেক আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল সেটা কিরকম বাবা?
- পীর বাবা বললেন, এটা হচ্ছে অবাধ্যকে বাধ্য করার ছুরি। এই ছুরি আমি অনেক তন্ত্র মন্ত্রের বিনিময়ে বানিয়েছি। তোমার পীর মা যখন তখনই আমার কথা শুনতো না। তাই তাকে শায়েস্তা করার জন্য আমি এই ছুরি বানিয়েছি। এটার বিশেষ্যত্ব হলো কেউ যদি তোমার অবাধ্য হয় তবে তুমি এই ছুরি দিয়ে তার গলা কেটে ছুরিতে লেগে থাকা রক্ত পানিতে ধুয়ে সেই পানি যদি তার কাটাস্থানে লাগিয়ে দাও তবে সে ভালো তো হবেই সেই সাথে তোমার বাধ্য হয়ে যাবে। কখনো তোমার সাথে দ্বিমত পোষন করবে না।
যদু মধু আর ভাদু একে অন্যকে ফিসফিসিয়ে বলতে লাগল শোন পীর বাবার কেরামতি দেখে তাকে আর কিছু বলার সাহস আমার হচ্ছে না। ভাদু বলল তবে একটি কথা পীর বাবার এই ছুরিটি যদি আমরা কোনো রকমে নিয়ে যেতে পারতাম তবে আমাদের অবাধ্য বউ গুলোকেউ আমরা বাধ্য করতে পারতাম। যদু বলল, কিন্তু পীর বাবা তো এটা দিয়ে পীর মাকে শায়েস্তা করেন, তিনি কি তা আমাদেরকে দিবেন? মধু বলল, আজ পর্যন্ত পীর বাবার কাছে যা চেয়েছি তার সবই তিনি আমাদের দিয়েছেন এবারো তিনি নিশ্চই আমাদের কথা রাখবেন। চল আমরা একবার চেয়েই দেখিনা, বলেই তারা তিনজনই পীরবাবার নিকটে গিয়ে বলতে লাগল, বাবা আমরা না বুঝে আপনাকে অনেক কটু কথা বলে ফেলেছি। আপনি আমাদের ক্ষমা করে দেবেন। আর বাবা আপনার কাছে আমাদের আর একটি আরজি আছে, যদি অনুমতি দেন তো বলি?
- ঠক পীর বাবা মনে মসে হাসতে হাসতে বললেন, আমি তো জানি তোমরা কি বলবে, তিনি একটু গম্ভির হয়ে শান্ত স্বরে বললেন, আমি আগেই বলেছি তোমরা আমার ছেলের মতো। আমি তোমাদেরকে আমার সাগরেদ বানিয়েছি। আমার কাছে যদি কোনো জিনিস থেকে থাকে আর সেটা যদি তোমরা চাও তবে আমি অবশ্যই তোমাদেরকে দিব। বল তোমাদের আরজি কি?
- ভাদু বলল, বাবা আপনার বউমারা মানে আমাদের বউয়েরা কিন্তু আমাদের কথা ঠিকমতো শুনে না। তাদের ডানে যেতে বললেন বামে যায়, তারা একেবারেই আমাদের অবাধ্য। মধু এবার মিনতি ভরা কণ্ঠে বলল, তাই বলছিলাম যে আপনার এই ছুরিটি যদি আমাদের দিতেন তবে আমরা খুব উপকৃত হতাম। আমাদের বউগুলো আমাদের বাধ্য করতে পারতাম।
পীর বাবা একটু অন্যমনস্ক হয়ে বললেন, দেখ এটা আমি তোমাদের পীর মায়ের জন্য বানিয়েছিলাম। তবে আমি সব সময়ই চাই যে তোমরা সুখে থাক। তাই তোমাদের এই আবদারো আমি রাখলাম, বলে পীর বাবা তাদেরকে সেই ছুরিটা দিয়ে দিল।
ছুরি পেয়ে তারা তিনজনই খুশিতে ডগমগ হয়ে বলতে লাগল সত্যিই বাবা আপনি একজন দয়ার মানুষ। আপনার মতো একজন পীর বাবা পেয়ে আমাদের জীবন ধন্য হয়ে গেল। ঠক সাহেব মনে মনে হাসতে হাসতে বলতে লাগলেন, জীবন ধন্য হলো না পুরে ছাই হলো তা পরে বুঝতে পারবে। তিনি বলে উঠলেন, শোন বাছারা আমি সর্বদাই তোমাদের মঙ্গল চাই। এই বলে তিনি হাত উঠিয়ে তাদের তিনজনের জন্য জোরে জোরে দোয়া করে দিলেন।
সেই ছুরিটি হাতে নিয়ে তারা একজন একজন করে নেরে চেরে দেখতে লাগল। আর বলতে লাগল, পীর বাবা কি চমৎকার জিনিসই না বানিয়েছেন মানুষকে বাগে আনার জন্য। বাড়ি ফেরার পথে সবার বড় ভাদু বলল শোন আমি তোমাদের সবার বড় আর আমার বউটা একটু বেশিই বেয়াদপ। সে কথাই কথাই আমার সাথে ঝগড়া করে তাই আমিই প্রথমে এই ছুরি নিয়ে যাব। যদু আর মধু সায় দিলে বলল, ঠিক আছে ভাই আগে তুমিই ব্যবহার কর।
সেদিন রাতে ভাদু বাড়ি ফিরেই কথা অকথায় তার বউয়ের সাথে শুধু শুধু ঝগড়া আরম্ভ করে দিল। তারপর এক পর্যায়ে সে বলল, বেয়াদপ, দ্বারা এখনি তোকে মজা দেখাচ্ছি বলেই সে তার বউকে ফেলে দিয়ে ধারালো ছুরিটি দিয়ে তার বউয়ের গলায় চালিয়ে দিল। আর সাথে সাথে গলা থেকে লাল রক্ত পড়তে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার বড় মারা গেল। ভাদু তখন একটু জিরিয়ে নেই একটি বাটিতে করে পানি এনে ছুরির রক্ত ভালো করে ধুয়ে তার বউয়ের গলায় সেই পানি ছিটাতে লাগল। কিন্তু মরা মানুষ কি করে বেচেঁ উঠতে পারে। এদিকে ভাদু বাটির সমস্ত পানি শেষ করেও যখন তার বউ উঠে না তখন সে একটু চিন্তিত হয়ে পড়ল। সে দৌড়ে গিয়ে এক বালতি পানি এনে সেই ছুরি ধুয়ে তার বউয়ের গলায় এবং সারা গায়ে খুব করে ছিটাতে লাগল। শেষমেষ পুরো বালতির পানি বউয়ের শরীরে ঢেলে দিয়েও যখন সে উঠল না তখন ভাদু মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। সে বুঝতে পারলো যে তারা মস্ত বড় ঠকের পাল্লায় পড়েছে। সে তাদেরকে আচ্ছা করে ঠকিয়েছে। সে বউয়ের শোকে কাঁদতে লাগল।
এদিকে সে মনে মনে আরো একটি বিষয় ভাবতে লাগল যে, আমার বউ একলা মরবে কেন? তাদের বউও মরুক তারপর আমরা তিনজন মিলে এর প্রতিশোধ নিব। এই বলে সে ছুরিটি নিয়ে ভালো করে ধুয়ে রেখে দিল।
পরদিন সকালে যদু ভাদুর বাড়িতে এসে জানতে চাইল কি ব্যাপার ভাই ছুরি দিয়ে কি কাজ হয়েছে কেমন? ভাদু তার মনের দুঃখ মনে চেপে রেখ বলল হ্যারেঁ যদু খুব কাজে দিয়েছে। কাল রাত থেকে তোর ভাবি এমন সোজা হয়েছে যে আমার সাথে আর টু শব্দটি করে না। আমার সাথে একদম ঝগড়া করে না। কোনো বিষয় নি আমার সাথে ঝগড়া করে না।
এই কথা শুনে যদুর যেন তার তর সইছিল না। সে বলল, ভাই তারাতারি আমাকে ছুরিটি দাও। আমি আগে আমার বউকে বাধ্য করি গে। ভাদু ছুরিটি এনে দিলে যদু ছুরি পেছনে লুকিয়ে ছুটে চলল তার বাড়ির দিকে। বাড়িতে এসেই তার বউয়ের সাথে শুধু শুধু ঝগড়া বাধিয়ে দিল। আর কিছুক্ষণই পরই সে তার বউকে ফেলে দিয়ে তার গলায় ছুরি দিয়ে তাকে জবাই করে দিল। তারপর বাটিতে করে পানি এনে ছুরি ধুয়ে সেই পানি তার বউয়ের গলায় দেওয়ার পরও যখন উঠে বসল না তখন সে ভাবতে লাগল, কি ব্যাপ্যার আমার কি কোথায় কোনো ভুল হলো নাকি! এই ভেবে সে তারাতারি ছুটে চলল ভাদুর বাড়ির দিকে। ভাদুকে দেখেই সে ব্যস্ত ও চিন্তিত হয়ে বলতে লাগল, ভাই আমি বোধহয় কোনো ভুল করে ফেলেছি। ছুরি পানি গলায় ঢালার পরো আমার বউ জীবিত হচ্ছে না।
ভাদু তখন মনের দুঃখে বলতে লাগল ভাই তুই কোনো ভুল করিস নি। আমরা সবাই ঠকেছি। ওই ব্যাটা পীর নয়। সে একটা ভন্ড। সে আমাদের সবাইকে ঠকিয়েছে।
যদু চোখ বড় বড় করে বলতে লাগল কি বলছিস ভাই, তারমানে তোর বউও মরে গেছে?
- হ্যাঁ, তবে শোন আমাদের বউযে মরেছে তা মধুকে বলিস না। আমাদের দুজনের বউ কেন শুধু শুধু মরবে? তারটাও মরুক।
তাদের গল্পের মাঝেই মধু চলে এলো। এসেই বলল, কি ব্যাপার ভায়েরা তোমাদের বউকে কি বাধ্য করতে পেরেছো? তারা দুজনই বলে উঠল আরে বাধ্য মানে একেবারে বাধ্য। এখন তারা কোনো কথার প্রতিই দ্বিরুক্তি করে না। আমরা যা বলি তাই মেনে চলে।
এই কথা শুনে মধু বলল, আমার আর তর সইছে না তারাতারি ছুরিটি দাও এবার আমার বউকে একটু শায়েস্তা করে আসি।
মধু ছুরি নিয়ে গিয়ে তার বউকেও একি অবস্থাই জবাই করে ছুরি ধোয়া পানি ঢেলে যখন ভালো হচ্ছে না তখন সে তাদের দুজনের কাছে ছুটে এলো। ভাদু সব ঘটনা খুলে বললে, মধু বলল, ওই ব্যাটার এতো বড় সাহস। সে আমাদের তিন ভাইকে এরকম করে ঠকায়। মধু রাগে গড় গড় করতে করতে বলল ভাই চল, আর কোনো কথা নয় এবার গিয়ে ঐ ব্যাটার কোনো কথা শুনব না। যদুও উত্তেজিত হয়ে ঘর হতে লাঠি এনে বলল, চল আজ গিয়ে ওর ঘরবাড়ি সব জ্বালিয়ে পুরিয়ে ওকেও শেষ করে দিয়ে আসব। বলেই তারা তিনজনই বড় বড় লাঠি সোটা নিয়ে চলল ঠক পীরের বাড়ির উদ্দেশ্যে।
সাত.
ঠক পীর আগে থেকেই অনুমান করে নিলেন যে তারা এবার কি রকম উত্তেজিত হয়ে আসবে। তিনি এবারও তাদেরকে রুখতে একটি বুদ্ধি আটলেন। তিনি তার উঠোনে কবরের মতো করে একটি গর্ত খুঁড়লেন। তার বউকে শিখিয়ে দিলেন, শোন তারা এবার খুব রেগে মেগে আসবে। আমার কিংবা তোমার কোনো কথাই শুনবে না। আমি এই গর্তের মধ্যে ঢুকে বসে থাকব। আর তুমি বসে বসে কাঁদবে। তারা আমার কথা জানতে চাইলে বলবে যে, তোমাদের পীর বাবা দুনিয়া ছেরে চলে গেছেন। তবে তিনি তোমাদের সমস্যাগুলি সমাধান করার একটি পন্থা বলে দেবেন। তোমরা কবরের ওপরে কান লাগিয়ে শুনো গিয়ে। এই বলে ঠক পীর গর্তের ভিতরে ঢুকে গেলেন। গর্তে ঢুকার আগে তিনি একটি ছুড়ি সাথে করে নিয়ে ঢুকলেন। আর তার বউকে বললেন এবার তুমি গর্তের উপরে চাটাই দিয়ে তার উপর মাটি দিয়ে ঢেকে দাও। আর ঢাকার পূর্বে গর্তের মাছে একটি ফুটো রেখে দিও। তার বউ তাই করল।
ভাদু, যদু আর মধুকে উত্তেজিত অবস্থায় লাঠি সোটা নিয়ে আসতে দেখেই ঠকের বউ তারাতারি বসে পড়ল এবং হাউ মাউ করে কাঁদতে লাগল।
তারা রাগান্বিত অবস্থায় এসেই হুমকি ধুমকি দিয়ে চিৎকার করতে লাগল, ঠকের বাচ্চা বেরিয়ে আয়, আজ তোর ঠকামো বের করব। আজ তোর শেষ দিন। তোকে মেরে তবেই আমরা এখান থেকে যাব। আজ আর কোনো কথা আমরা শুনব। এভাবে চিৎকার চেঁচামেচি করার সময় তারা দেখল তার বউ বসে বসে কাঁদছে। তারা চিৎকার করে বলে উঠল এই ঠকের বউ কই তোর স্বামী? তাকে বেরিয়ে আসতে বল। আজ তার সাথে আমাদের শেষ বোঝাপড়া আছে। ঠকের বউ আরো জোড়ের হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, কিন্তু বাবারা তোমাদের পীর বাবা তো বাইরে আসতে পারবে না।
ভাদু চিৎকার করে বলে উঠল বাইরে আসতে না পারলে আমরা ভিতর থেকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসব। ঠকের বউ কাঁদতে কাঁদতে বলল বাবারা তোমাদের পীর বাবা গত রাতেই মারা গেছেন। এই কথা শুনে তারা তিনজনই কিছুটা দমে গেল। ঠকের বউ আবার বলল, তিনি মারা যাওয়ার পূর্বে আমাকে বলে গেছেন যে তোমরা অনেক সমস্যাই ভুগছ। আর তাই তিনি বলে গেছেন তোমরা এলে তার কবরের ওপরে কান রেখে শুনতে উনি তোমাদের পরামর্শ দেবেন। যাতে তোমাদের সকলের সমস্যা সমাধান হয়ে যায়।
এই কথা শুনে তারা একটু শান্ত হলো। ভাদু বলল শোন আমি তোদের সবার বড়, আর আমার বউ সবার আগে মরেছে, তাই আমি সবার আগে যাব গিয়ে বাবার পরামর্শ শুনে আসব। তারাও সম্মতি দিল।
ভাদু তখন বাবার কবরের ওপরে যেখানে আগে থেকেই একটি ফুটো করে রাখা হয়েছিল সেখানে তার কান রাখল। ভিতরে থাকা ঠক বাবা তখন তার বাম হাত দিয়ে কান ধরে রেখে ধারালো ছুরি দিয়ে কচাৎ করে এক টানে কান কেটে দিল।
ভাদু ব্যথায় চিৎকার করতে গিয়েও করল না। সে ভাবল, আমার একার কান কাটা থাকবে আর তারা দুজন কান নিয়ে থাকবে তা কখনোও হতে পারে না। সে মনে মনে বলল তাদের দুজনের কানও কাটানো দরকার। তাহলে সবাই একই থাকব। এই ভেবে সে এক হাতে তার কান চেপে ধরে উঠে দাড়াল। আর ব্যথায় অস্থির হয়ে শুনেছি শুনেছি বলে চিৎকার করতে করতে দৌড়ে বাড়ির পথে যেতে লাগল।
যদু ও মধু তখন ভাবতে লাগল ভাদু তো সব শুনেছে। এখন তো সে তার বউকে ঠিক করে ফেলতে পারবে তাই এত তারাতারি দৌড়ে চলে গেল। মধু তড়িঘরি করে কবরের কাছে ছুটে যেতে চাইলে যদু বলল, দাঁড়া মধু দ্বিতীয়বারে আমি আমার বউকে জবাই করেছি তাই এবার আমার পালা। আমি আগে যাই বলেই সে এক দৌড়ে কবরের কাছে গিয়ে তার কান ছিদ্রের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। ঠক সাহেব তার কান ধরেও একই ভাবে কচাৎ করে একটানে ছুরি দিয়ে কেটে দিল।
কান কাটার পরই অসহ্য যন্ত্রনায় কান চেপে ধরে যদু সব বুঝতে পারল যে, ভাদুরও ঠিক একই অবস্থা হয়েছে। কিন্তু সে সবার কান কাটানোর জন্য কিছু না বলে দৌড়ে চলে গেছে। সে ভাবল আমাদের দুজনের কান কাটা থাকবে আর মধু কান নিয়ে ঘুরে বেড়াবে এটা হতে পারে না। তাই সেও তার কান চেপে ধরে শুনেছি শুনেছি বলে চিৎকার করতে করতে বাড়ির দিকে দৌড়েতে লাগল।
মধুর যেন আর তর সইছে না। সে ভাবল তাদের দুজনের বউ তো ঠিক হয়ে যাবে, তাই সে তৎক্ষনাৎ ছুটে গিয়ে কবরের কাছে কান দিল। আর সঙ্গ সঙ্গে ঠক বাবাজী তার কান ধরে কচাৎ করে এক টানে কেটে দিল।
মধু সাথে সাথে ব্যথায় ককিয়ে উঠল। সে বুঝল তাদের দুজনেরও এই একই অবস্থা হয়েছে। সে পরিমরি করে সেখান থেকে বাড়ির পথে ছুটে পালালো। কান রেখে পালানোর পর আর কখনো তারা ঠক পীরের বাড়ি মুখো হয়নি।
---- সমাপ্ত ----